• লেখা পাঠান: ask@gograse.com

  • একশো পেরিয়েও তরুণ…তরুণ নিকেতন

    একটু টাইম ট্রাভেল করে এলাম বুঝলেন। যাবেন না কী?

    কীভাবে?

    রাজা বসন্ত রায় রোড চেনেন? সতীশ মুখার্জি রোড? আরে রাসবিহারী মোড় বা গড়িয়াহাট মোড় তো চেনেন রে বাবা, প্রথমটায় দাঁড়ালে ডান হাতের ফুটপাথ ধরে দ্বিতীয়টার দিকে এগোবেন আর দ্বিতীয়টায় দাঁড়ালে বাম হাতের ফুটপাথ ধরে প্রথমটার দিকে চলবেন। সুবিধা রাসবিহারীতে দাঁড়ালেই হবে কারণ দূরত্ব তুলনায় বেশ কম।

    চলতে চলতে নিজে ‘র’ এর দক্ষতায় নজর করুন ফুটপাথের উপরে দুটি সবুজ লোহার ডাণ্ডার মাথায় বসে আছে একটা ইলেকট্রনিক বোর্ড যাতে লালের উপরে শাদা গোটা গোটা অক্ষরে ‘HOTEL TARUN NIKETAN’ লেখা এরম কিছু খুঁজে পাচ্ছেন কি না। পেলে, আরও নিশ্চিত হতে কপালের পেশী ব্যবহার করে দেখে নিন একটু ছোট হলেও ওরই উপরে নীলে ‘হোটেল তরুণ নিকেতন’ পড়া যাচ্ছে কি না।

    আছে? যাচ্ছে? আর কী, ঢুকে পড়ুন।

    কী বলছেন? যে এ তো হিন্দু পাইস হোটেল, হোয়্যার ইজ প্রোপোজড টাইম ট্রাভেল?

    কী মুশকিল, ওই বোর্ডের তলা দিয়ে ঢুকে চিলতে গলি দিয়ে এগিয়ে হাট করে রাখা কাঠের দরজাটা পেরোলেই তো ঢুকে পড়বেন এক্ষুণি অতীতের দুনিয়ায়। গত শতকের শুরুর কিছু পরেই যার পথচলা শুরু আর এই শতকের কুড়ি-বাইশটা বছর কাটিয়েও যে সেই আদ্যিকালের চেহারা ধরে রেখেছে সদর থেকে খিড়কি সর্ব্বত্র তার পেটের ভেতর সেঁধোনো একপ্রকার টাইম ট্রাভেলই তো বটে।

    নয় কি?

    হ্যাঁ, শ্ৰী জগৎ চন্দ্র দেব এই হোটেল খোলেন ১৯১৫ সালে। সেই থেকে কালীঘাট চত্ত্বরের কাছেপিঠের এক সেকেলে বাড়ির একতলার লম্বা একটা ঘর ও আশপাশের কিছু ঘর নিয়ে চলছে ভাত মাছের বেচাকেনা। সবুজ রঙ সম্ভবত বর্তমান মালিকের বড় পছন্দের। নামের বোর্ড লোহার রড থেকে শুরু করে জানলা হয়ে দেওয়ালের খানিক খানিক অংশ যেখানে যেখানে সম্ভব সবুজে রঙিন। ওহ, প্রসঙ্গত বলি, বর্তমান মালিক শ্ৰী অরুণ দেব। উঁচু ছাদের নীচে ফলস সিলিং দেওয়া ও সেটা থেকে ঘটঘট ফ্যান ঝোলা এবং কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানলাওলা খাওয়ার ঘরটা লম্বালম্বি বেঁটে পাঁচিল ও তার উপরে কাঠের ফ্রেমে ঘষা কাচের চৌকো টুকরোর রেলিং দিয়ে দুইভাগ করা, দুই ধারের দেওয়াল ও মাঝের এই পার্টিশনের দুই দিকের গায়ে ঘেঁষানো স্লিমট্রিমড মার্বেল(?!) টপ টেবিলগুলোও লম্বালম্বি রাখা। এ প্রান্তে একজন আর ও প্রান্তে আরেকজন বসবে। আগে নিশ্চয় কাঠের টুল বা চেয়ার ছিল, এখন প্লাস্টিকের। ঘরময় হেঁশেলের ঝাঁঝালো গন্ধ। ঢোকার দরজার পাশেই মালিকের হিসেবের টেবিল একই রকম বেঁটে পাঁচিলের ওধারে। একটা আধা কেবিন আছে টেবিলের নাক বরাবর ঘরটার সেই শেষ প্রান্তে। আধা কারণ সে খুপরি কেবল বেঁটে এক পাঁচিলে ঘেরা। বাদবাকি উন্মুক্ত।

    আমি সেদিকে যাইনি, ওপারের লোক পিঠে ছাপ তো তাই স্বভাববশতঃ পার্টিশনের ওই পারেই গেলাম বসতে কিন্তু ডিঙ্গি মেরে মেরে হেঁটে। কেন? এখানে পাঁচিল সেখানে পাঁচিল ওখানে পাঁচিলময় মেঝেটা এককালে মসৃণ শানের ছিল এখন খসখসে খড়া মারা হয়ে গিয়েছে তাতে আবার যুগের পর যুগ জল পড়ে পড়ে ও জমে থেকে থেকে চিরকালীন প্যাঁচপ্যাঁচে অবস্থা।

    Tarun Niketan2

    যাক, মালিককে গিয়ে বল খোকা থুড়ি খুকী এসেছে এরম বলবার মত কাউকে হাতের কাছে না পেয়ে আত্মনির্ভর হয়ে লেগে পড়লাম পছন্দসই টেবিল বাছতে। একুশে বসে একুনে কতগুলো ঠাকুর দেবতার বাঁধাই ছবি দেখে ফেললাম চার দেওয়ালে তাই গুনে নিলাম। খান দশেক তো বটেই, বেশিই হতে পারে। খাবার দোকানের সঙ্গে অন্নপূর্ণা ভোলেবাবার সম্পর্ক যদি মেনেও নিই, বাবা লোকনাথ থেকে মা রক্ষেকালী এখানে ঝুলে আছেন কেন এ প্রশ্ন জাগা মাত্র উত্তর মা কালীই দিলেন। কালী ক্ষেত্রের উঠোনে হোটেল, নামে বিশেষ করে হিন্দু জোড়া, সেকালের নিরিখে এসবের প্রমাণস্বরূপ ছবিছাবা রাখতে হয় বৈকি। ইমপ্যাক্ট অব অ্যামবিয়েন্স বলে একটা কথা আছে না! মেনু বোর্ডের মাথায় ―

    “পেঁয়াজ নাই

    প্রতিটি খাদ্যদ্রব্য পেঁয়াজ ও রসুন বিহীন

    ব্যতিক্রম : মাছের কালিয়া, মাংসের কারী ও ডিমের কারী”

    ― এরকম লেখারও অনুপ্রেরণা সেই কালীক্ষেত্রই নির্ঘাত যদিও মালিকেরা পূর্বপুরুষদের গুরুনির্দেশ বলেও দাবি করে থাকেন।

    এক ভদ্রলোক অর্ডার নিতে এলেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম! মনে হল অভির্ভূত হলেন স্বয়ং দামোদর শেঠ ভার্সন ’21। এত বিশাল ভুঁড়ি চর্মচক্ষে দেখা আমার এই প্রথম। এক টেবিলের শেষে যদি ওঁর কোমর থেকে তো ভুঁড়ির ডগা ঠেকছে আরেক টেবিলের শেষে।

    কী কী আছের জবাবে গড়গড় করে আউড়ে গেলেন শুক্তো থেকে চাটনি অবধি পঞ্চাশটা মত পদ। নাম বলছে না নামতা পড়ছে রে বাবা!

    নয়ন ও কর্ণ সার্থক করে অর্ডার দিলাম।

    কলাপাতা, নুন, গন্ধরাজ লেবু, কাঁচা লঙ্কা, মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল, মাছের ডিমের বড়া, মাছের মুড়ো কাঁটা তেল দিয়ে চচ্চড়ি, আড় মাছের কালিয়া আর ইলিশের সর্ষে ঝোল।

    হ্যাঁ, যা চাইবেন সব আলাদা আলাদা অর্ডার দিতে হবে, এমন কি কলাপাতা পর্যন্ত, কারণ ―

     “বিঃ দ্রঃ এই প্রতিষ্ঠান সম্যকরূপে ‘পাইস হোটেল’-র নিয়মানুসারে পরিচালিত”।

    প্রত্যেকটির দাম আলাদা আলাদা করে নেওয়া হয়ে থাকে। অ্যালুমিনিয়াম জগের জল নিখরচায়।

    Tarun Niketan_3

    ধোয়া পাতা গেলাস পড়ল। জল নুন লেবু লঙ্কার পরে এল খাবার।

    ভাত ভালো চালের, ডাল ঠাণ্ডা, বড়া আরও ঠাণ্ডা, চচ্চড়িও তদ্রূপ কিন্তু স্বাদে বিশেষ খামতি নেই। মাছের কালিয়া ও ঝোল এল বেশ গরম। বিশেষ করে সর্ষে ঝোল তো টগবগে যাকে বলে! তরকারির পরিমাণ দুই বাটি তিনজনের জন্য ঠিকঠাক, মাছ মাঝারি মাপে এক টুকরো করেই। আলুটা ভালো সাইজের। বড়াটা বিশাল। ঝালটা মাপমত, হাল্কা মশলায় রাঁধা খাবারগুলো সেকালের ঘরোয়া রান্নাকে মনে করাবে। অনবদ্য বলতে না পারলেও বেশ ভাল, দিব্য এইটুকু বলাই যায়।

    তবে পরিচ্ছন্নতায় একেবারেই মানোত্তীর্ণ নয়, বেশ খারাপ। বিশেষ করে হাত ধোবার জায়গাটায় গিয়ে তপন বাবুর “গল্প হলেও সত্যি”-র জাদুকর রাঁধুনিকে হাঁক ছেড়ে ডাকতে সাধ হচ্ছিল। জায়গার হাল দেখে তাঁর দুটি নারকেল মালা দিয়ে মনিবের জন্মের স্যাঁতলা পড়া উঠোন ঘষে সাফ করার দৃশ্য মনে পড়ে গেছিল ধাঁ করে। বড্ড প্রয়োজন।

    আরেকটি জিনিসের উল্লেখ না করলে জার্নি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভাত কলাপাতায় দিলেও যে বাটিতে ডাল দিয়েছিল সেটার জন্ম আমার বাপের জন্মেরও আগে, তলা বার দুয়েক ঝালাই করা।

    এখনও সন্দেহ আছে টাইম ট্রাভেল করছেন কি না?

    নেই তো, বেশ বেশ।

    এই রে, চিন্তায় পড়েছেন? ফেরার রাস্তা খুঁজছেন? খুব সোজা। কত হল প্রশ্নের উত্তরে যা শুনবেন তাতে দড়াম করে সেকাল থেকে এসে পড়বেন একালে। তবে, সহ্যসীমার বাইরে নয়। আমরা দুইজনে খেয়েছি সব একটা করে নিয়ে কেবল কলাপাতা ইত্যাদি প্রভৃতি ও ভাত দুটো তাতে পড়ল ৭২৪ টাকা।

    অতএব, চরৈবেতি!

    ঠিকানা রইল ―

    হোটেল তরুণ নিকেতন।
    ৮৮/১বি, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ,
    কালীঘাট মেট্রো স্টেশানের কাছে,
    কোলকাতা – ৭০০ ০২৬।


    Gograse
    December 13, 2021 | 537 views

    ইংরেজি ভাষা–সাহিত্য বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শেষে বর্ত্তমানে পেশা শিক্ষকতা। আশির দশকে মফস্বলে জন্ম, নিবাসও। ব্লগ ও সামাজিক মাধ্যমে সাহিত্যধর্মী লেখালেখির সূত্রেই পরিচিতি। দুই বাংলার বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশ পেয়েছে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এবং রম্যরচনা।

    আকাশবাণী কলকাতার মৈত্রী প্রচারতরঙ্গে প্রচারিত একাধিক বিষয়নির্ভর কথিকার লেখিকারূপে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। “আনন্দনগরীর সেকাল” প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।

    0 0 votes
    Article Rating
    Subscribe
    Notify of
    guest
    0 Comments
    Inline Feedbacks
    View all comments
    0
    Would love your thoughts, please comment.x
    ()
    x